বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বৃহৎ অংশ দাঁড়িয়ে আছে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা—সব মিলিয়ে লক্ষাধিক শিক্ষক ও কর্মচারী প্রতিদিন শিক্ষাদানের মাধ্যমে জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছেন। অথচ তাদের জীবনের আর্থিক নিরাপত্তা, সম্মানজনক জীবনযাপন ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রশ্নবিদ্ধ থেকে গেছে দীর্ঘদিন। এমপিও (Monthly Pay Order) ব্যবস্থার আওতায় থাকা শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ভাতা কাঠামো, নীতিমালা ও বাস্তব চিত্র জানার আগ্রহ তাই স্বাভাবিকভাবেই সবার।
এই প্রবন্ধে আমরা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এ.পি.ও. নীতিমালা ২০২১, জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫, এবং ২০২৬ সাল পর্যন্ত কার্যকর এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ভাতা নিয়ে একটি বিস্তৃত, বিশ্লেষণধর্মী ও বাস্তবভিত্তিক আলোচনা উপস্থাপন করছি।।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন কীভাবে প্রদান করা হয়?
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ভাতা প্রদান করা হয় নিম্নোক্ত পদ্ধতিতে—
- জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী মূল বেতন নির্ধারণ
- মোট বেতনের একটি অংশ সরকার বহন করে
- বাকি অংশ সংশ্লিষ্ট স্কুল বা কলেজ বহন করে
- সরকারী অংশ প্রতি মাসে সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাবে প্রেরণ করা হয়
- শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে সরাসরি অর্থ পরিশোধ করা হয়
একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষকের মাসিক মোট বেতন ভাতার গঠন (উদাহরণসহ)
একজন এমপিওভুক্ত সহকারী শিক্ষক (নতুন যোগদানকারী, প্রশিক্ষণবিহীন) সাধারণত যেসব ভাতা পান—
- মূল বেতন: ১২,৫০০ টাকা
- বাড়ি ভাড়া ভাতা: ১,০০০ টাকা (নির্ধারিত)
- চিকিৎসা ভাতা: ৫০০ টাকা
- বিশেষ সুবিধা: ১,৮৭৫ টাকা
মোট বেতন:
১২,৫০০ + ১,০০০ + ৫০০ + ১,৮৭৫ = ১৫,৭৮৫ টাকা
কর্তন:
- কল্যাণ অনুদান (মূল বেতনের ১০%): ১,২৫০ টাকা
হাতে প্রাপ্ত বেতন:
১৫,৭৮৫ – ১,২৫০ = ১৪,৬২৫ টাকা
এই অর্থ সরাসরি ব্যাংক হিসাবে জমা হয়।
একজন উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আসলে কত টাকা বেতন পান
এখানেই বাস্তবতার সঙ্গে নীতিমালার পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নিম্ন-মাধ্যমিক/মাধ্যমিক/উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ের একজন নতুন যোগদানকারী এমপিওভুক্ত সহকারী শিক্ষক (বিএড ছাড়া) পান—
- মূল বেতন: ১২,৫০০ টাকা
- বাড়ি ভাড়া: ১,০০০ টাকা
- চিকিৎসা ভাতা: ৫০০ টাকা
মোট: মাত্র ১৪,০০০ টাকা
বর্তমান বাজারদর, দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় এই বেতন দিয়ে একটি পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করাও কঠিন।
১০ম গ্রেডে বেতন পেতে হলে কী করতে হবে?
১০ম গ্রেড এমপিওভুক্ত সহকারী শিক্ষকদের জন্য একটি কাঙ্ক্ষিত ধাপ। তবে এর জন্য কিছু নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হয়।
যোগ্যতা ও শর্তাবলি:
- নিম্ন-মাধ্যমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত হতে হবে
- এমপিওভুক্ত হতে হবে
- যোগদানের ৫ বছরের মধ্যে
- সরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ অথবা
- সরকার অনুমোদিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে
- শিক্ষায় ডিগ্রি (বিএড/বিএমএড/সমমান) অর্জন করতে হবে
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
- এই ডিগ্রির জন্য প্রাপ্ত ১০ম গ্রেডকে উচ্চতর স্কেল হিসেবে গণ্য করা হবে না
- জনবল কাঠামো জারির আগে যারা ডিগ্রিবিহীন ছিলেন, তারাও পরবর্তী ৫ বছরের মধ্যে এই ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ পাবেন
১০ম গ্রেডে মূল বেতন:
- ১৬,০০০ টাকা
- জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী স্কেল: ১৬,০০০ – ৩৮,৬৪০ টাকা
এমপিওভুক্ত অফিস সহায়ক, নিরাপত্তা কর্মী ও আয়ার বেতন কত?
শিক্ষক ছাড়াও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মাসিক বেতন ভাতা:
- মূল বেতন: ৮,২৫০ টাকা
- বাড়ি ভাড়া ভাতা: ১,০০০ টাকা
- চিকিৎসা ভাতা: ৫০০ টাকা
মোট মাসিক আয়:
৯,৭৫০ টাকা
উৎসব ভাতা:
- মূল বেতনের ৫০% হারে বছরে দুইবার
এমপিওভুক্ত শিক্ষক উৎসব ভাতা ২৫% না ৫০%?
এই প্রশ্নটি শিক্ষক সমাজে দীর্ঘদিনের বিতর্ক।
বাস্তবতা কী?
- ২০০৪ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী
- শিক্ষকরা: মূল বেতনের ২৫%
- কর্মচারীরা: মূল বেতনের ৫০% উৎসব ভাতা পান
এই নির্দেশনাই আজও কার্যকর রয়েছে।
তুলনামূলক বাস্তবতা:
- সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে
- ১০০% উৎসব ভাতা দেওয়া হয়
সম্প্রতি শিক্ষকদের উৎসব ভাতা ৫০% করার ঘোষণা এলেও বাস্তবায়ন এখনো সর্বত্র সমান নয়।
বৈশাখী বা বাংলা নববর্ষ ভাতা কি এমপিওভুক্তরা পান?
হ্যাঁ, পান।
হার:
- মূল বেতনের ২০%
উদাহরণ:
- ৮,২৫০ টাকা মূল বেতন → ১,৬৫০ টাকা
- ৭১,২০০ টাকা মূল বেতন → ১৪,২৪০ টাকা
এই ভাতা বছরে একবার প্রদান করা হয়।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন গ্রেড, অভিজ্ঞতা ও নিয়োগ যোগ্যতা (২০২৬)
সহকারী শিক্ষক (১০ম গ্রেড):
শিক্ষাগত যোগ্যতা:
- স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে
- গণিতসহ বিজ্ঞান / ব্যবসায় শিক্ষা / মানবিক শাখায় স্নাতক
- বিএড/সমমান ডিগ্রি
বয়সসীমা:
- অনূর্ধ্ব ৩৫ বছর
- ইনডেক্সধারীদের ক্ষেত্রে শিথিলযোগ্য
বেতন স্কেল:
- মূল বেতন: ১৬,০০০ টাকা
- স্কেল: ১৬,০০০ – ৩৮,৬৪০ টাকা
প্রশিক্ষণবিহীনদের ক্ষেত্রে:
- মূল বেতন: ১২,৫০০ টাকা
- স্কেল: ১২,৫০০ – ৩০,২৩০ টাকা
এমপিওভুক্ত কর্মচারী ও সরকারি কর্মচারীদের বেতন ভাতার পার্থক্য
| বিষয় | সরকারি (২০২৫) | এমপিওভুক্ত বেসরকারি (২০২৬) |
|---|---|---|
| মূল বেতন গ্রেড | জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ | জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ |
| বাড়ি ভাড়া | ৪৫%–৬০% | নির্ধারিত ১,০০০ টাকা |
| চিকিৎসা ভাতা | ১,৫০০ টাকা | ৫০০ টাকা |
| বৈশাখী ভাতা | ২০% | ২০% |
| উৎসব ভাতা | ১০০% | শিক্ষক ২৫%, কর্মচারী ৫০% |
| বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট | ৫% বা বেশি | নির্ধারিত ৫% |
| পদোন্নতি | বিদ্যমান | প্রায় নেই |
| বদলি | আছে | নেই |
| বিশেষ সুবিধা | ১৫% | ১৫% |
শেষ কথা
এমপিও ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি আশীর্বাদ। তবে বেতন ভাতা কাঠামো, ভাতার হার, পদোন্নতির সুযোগ এবং সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে বৈষম্য শিক্ষক সমাজকে ক্রমাগত হতাশ করছে।
একজন শিক্ষক যখন মাস শেষে মাত্র ১৪–১৫ হাজার টাকা হাতে পান, তখন তার কাছ থেকে মানসম্মত শিক্ষা, সামাজিক নেতৃত্ব ও নৈতিক দৃঢ়তা আশা করা কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন চাইলে শিক্ষকের আর্থিক মর্যাদা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ।
সময় এসেছে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো যুগোপযোগী করার, সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে যৌক্তিক সামঞ্জস্য আনার এবং শিক্ষা পেশাকে সত্যিকার অর্থে সম্মানজনক পেশায় রূপান্তর করার।



