হংকং—এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী অর্থনৈতিক কেন্দ্র। দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের এই প্রশাসনিক অঞ্চলকে শুধু একটি নগররাষ্ট্র বা ব্যবসার শহর বলা যথেষ্ট নয়; এটি এখন আন্তর্জাতিক বাজারের গুরুত্বপূর্ণ দরজা, যেখানে বিশ্বব্যাপী হাজারো মানুষ কাজ, ব্যবসা ও উন্নত জীবনের স্বপ্নে ছুটে আসছে। বাংলাদেশের হাজারো মানুষও প্রতিবছর এই উন্নত দেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করছেন।
তবে হংকং যাত্রার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— হংকংয়ে কাজের বেতন কত, ভিসার খরচ কেমন, সর্বনিম্ন মজুরি কত, আর একজন বাংলাদেশির যেতে মোট খরচ কত হতে পারে। এই প্রবন্ধে আমরা এসব প্রশ্নের গভীর ও বিস্তারিত উত্তর তুলে ধরবো।
হংকং কাজের বেতন কত
হংকং একটি ব্যস্ততম বাণিজ্য ও সেবা নির্ভর নগররাষ্ট্র। এখানে অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও কাজের ধরণ অনুযায়ী বেতনের পরিমাণ পরিবর্তিত হয়।
- সাধারণ শ্রমিক ও হেল্পার: মাসে গড়ে ৩০,০০০ – ৩৫,০০০ টাকা (হংকং ডলার রূপান্তরে প্রায় ২,২০০ – ২,৫০০ HKD)।
- অভিজ্ঞ শ্রমিক বা কারিগরি কাজ: যেমন ইলেকট্রিশিয়ান, মেকানিক, কাঠমিস্ত্রি – মাসে প্রায় ৪০,০০০ – ৫০,০০০ টাকা।
- ড্রাইভার বা বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন কাজ: মাসে ৫০,০০০ – ৭০,০০০ টাকা পর্যন্ত বেতন পাওয়া যায়।
- অফিস সহায়ক, সেলস, রেস্টুরেন্ট স্টাফ: মাসে ৩৫,০০০ – ৪৫,০০০ টাকা।
- প্রফেশনাল কাজ (আইটি, ফাইন্যান্স, হোটেল ম্যানেজমেন্ট): মাসে ৮০,০০০ – ১,৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত আয় সম্ভব।
গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বাংলাদেশি শ্রমিকরা সাধারণত শ্রম নির্ভর কাজেই বেশি নিয়োজিত হন, তাই শুরুতে বেতন তুলনামূলক কম হলেও overtime করলে আয় বাড়ে।
হংকং কাজের ভিসা ২০২৬
যেকোনো বিদেশে বৈধভাবে কাজ করতে হলে ভিসা অপরিহার্য। হংকংও এর ব্যতিক্রম নয়।
- জব ভিসা/ওয়ার্ক পারমিট ভিসা:
খরচ সাধারণত ৪,০০,০০০ – ৬,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত হয়। তবে সরকারি নিয়োগ (বোয়েসেল বা BOESL-এর মাধ্যমে) করলে খরচ তুলনামূলক কম হয়। - স্টুডেন্ট ভিসা:
পড়াশোনার জন্য যারা যেতে চান তাদের খরচ তুলনামূলক কম, প্রায় ৩,০০,০০০ – ৪,০০,০০০ টাকা। - ট্যুরিস্ট ভিসা:
ভ্রমণের উদ্দেশ্যে গেলে প্রায় একই পরিমাণ খরচে (৩ – ৪ লক্ষ টাকা) ট্যুরিস্ট ভিসা করা যায়।
সতর্কতা: অনেক দালাল বা ভুয়া এজেন্সি অতিরিক্ত টাকা নিয়ে প্রতারণা করে থাকে। এজন্য সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান বা সরাসরি দূতাবাসের মাধ্যমে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা নিরাপদ।
হংকং এর সর্বনিম্ন বেতন কত
হংকং সরকার ন্যূনতম মজুরি আইন চালু করেছে। ২০২৬ অনুযায়ী, সর্বনিম্ন মজুরি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৪০ হংকং ডলার (HKD), যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৫০ টাকা।
যদি একজন শ্রমিক মাসে গড়ে ২৬০ ঘণ্টা কাজ করেন, তবে তার মাসিক আয় দাঁড়াবে প্রায় ২,২০০ HKD থেকে ২,৫০০ HKD, অর্থাৎ ৩০,০০০ – ৩৫,০০০ টাকা।
হংকংয়ে কাজের ধরণ ও সম্ভাবনা
বাংলাদেশিরা সাধারণত নিচের সেক্টরে কাজ করেন:
- নির্মাণ শ্রমিক
- গৃহকর্মী
- রেস্টুরেন্ট ও হোটেল স্টাফ
- সিকিউরিটি গার্ড
- ড্রাইভার
- দোকান ও সেলস স্টাফ
কিছু শিক্ষিত ও দক্ষ প্রবাসী আইটি, ব্যাংকিং, হেলথকেয়ার, ফাইন্যান্স, ইঞ্জিনিয়ারিং ক্ষেত্রেও কাজ পান।
হংকংয়ে জীবনযাত্রার খরচ বনাম আয়
হংকংয়ে আয় তুলনামূলক বেশি হলেও জীবনযাত্রার খরচও অনেক বেশি।
- বাসাভাড়া: ছোট একটি রুমের ভাড়া মাসে ১৫,০০০ – ২০,000 টাকা।
- খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ: মাসে ১০,০০০ – ১৫,০০০ টাকা।
- পরিবহন: মাসে ৫,০০০ টাকা গড়ে।
তবে অনেক শ্রমিক কোম্পানি প্রদত্ত হোস্টেল বা আবাসনে থাকেন, যেখানে খরচ অনেকটাই কমে যায়।
হংকং ভিসা জালিয়াতি ও প্রতারণা সতর্কতা
হংকং যাওয়ার নামে প্রতারণার ঘটনা প্রচুর।
- অনেক দালাল অস্বাভাবিক বেশি টাকা দাবি করে।
- ভুয়া ভিসা দিয়ে প্রবাসীদের বিপদে ফেলে।
- টাকা নিয়ে এজেন্সি বন্ধ করে পালিয়ে যায়।
সমাধান:
- কেবলমাত্র সরকার অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন করুন।
- প্রতিটি কাগজপত্র যাচাই করে নিন।
- সরাসরি হংকং ইমিগ্রেশন ওয়েবসাইট থেকে তথ্য নিন।
শেষ কথা
প্রতিবছর হাজারো বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের জন্য হংকং যাচ্ছেন। শুরুতে আয় তুলনামূলক কম হলেও overtime এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বেতন দ্রুত বাড়ে। তবে ভিসা প্রক্রিয়ায় সতর্ক থাকা, জালিয়াতি এড়ানো এবং সঠিক তথ্য জানা অত্যন্ত জরুরি।
হংকং কাজের বেতন গড়ে মাসে ৩০,০০০ – ৫০,০০০ টাকা, তবে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই অংক কয়েকগুণ বাড়তে পারে।
যারা হংকং যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তারা অবশ্যই সরকারি বিজ্ঞপ্তি ও অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমেই পদক্ষেপ নিন।



